খুঁজুন

সন্ধ্যার পর দরুদ শরীফের আসর: হারিয়ে যাওয়া এক সুন্দর রেওয়াজ

সন্ধ্যার পর দরুদ শরীফের আসর: হারিয়ে যাওয়া এক সুন্দর রেওয়াজ

ছোটবেলার কথা মনে পড়লে কত কিছুই না চোখের সামনে ভেসে ওঠে! সেই সময়ের সরল জীবন, পারিবারিক অনুশাসন, পিতা-মাতার স্নেহমিশ্রিত শাসন এবং ধর্মীয় মূল্যবোধের ছোট ছোট চর্চাগুলো আজও হৃদয়ে গভীরভাবে দাগ কেটে আছে। তেমনই একটি সুন্দর রেওয়াজ ছিল—প্রতিদিন সন্ধ্যা বা মাগরিবের আজানের পর হাত-মুখ ধুয়ে দরুদ শরীফ পাঠ করা। আমাদের শৈশবে এটি ছিল অনেক পরিবারের পরিচিত একটি পারিবারিক রেওয়াজ । মাগরিবের আজান শোনা মাত্রই পিতা-মাতা সন্তানদের বলতেন, “হাত-মুখ ধুয়ে দরুদ শরীফ পড়তে বসো। ”এটি কেবল একটি আমল পালনের নির্দেশ ছিল না বরং এর মধ্য দিয়ে সন্তানদের মনে ধর্মীয় অনুশাসন, পরিচ্ছন্নতা, শৃঙ্খলা এবং প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি ভালোবাসার বীজ বপন করা হতো।

দরুদ শব্দের অর্থ রহমত, দয়া ও করুণা প্রার্থনা করা। মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি আল্লাহর রহমত ও শান্তি বর্ষিত হোক এই প্রার্থনাই দরুদ। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতাগণ নবীর প্রতি দরুদ পাঠ করেন। হে মুমিনগণ! তোমরাও তাঁর প্রতি দরুদ পাঠ কর এবং যথাযথভাবে সালাম প্রেরণ কর” (সূরা আল-আহযাব, আয়াত ৫৬)। এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, দরুদ পাঠ শুধু একটি ঐচ্ছিক আমল নয়, বরং প্রতিটি মুসলমানের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।

সন্ধ্যায় মাগরিবের আজানের পর দিনের ব্যস্ততা কিছুটা থেমে যেত। তখন প্রতিটি ঘর থেকে ভেসে আসতো পবিত্র দরুদ শরীফের সুমধুর সুবাস। বিকেলে খেলাধূলার পর্ব শেষে শিশুরা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন দরুদ শরীফের আসর বসাতো। আর দরুদ শরীফ পাঠের মধ্য দিয়ে সন্ধ্যার সময়টুকু একটি পবিত্র আবহে শুরু হতো। ছোট্ট বয়সে হয়তো এর গভীর তাৎপর্য আমরা বুঝতাম না। কিন্তু সেই পবিত্র দরুদ শরীফের পাঠ চর্চা ধীরে ধীরে সকলের হৃদয়ের সঙ্গে মিশে যেত।

দরুদ শরীফ শুধু মুখে উচ্চারিত কিছু শব্দ নয় এটি প্রিয় নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার বহিঃপ্রকাশ। শিশুরা যখন শৈশব থেকেই দরুদ পাঠের অভ্যাস গড়ে তোলে, তখন তাদের হৃদয়ে নবিপ্রেমের একটি কোমল অনুভূতি জন্ম নেয়। সেই অনুভূতি পরবর্তীতে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জীবন, চরিত্র ও আদর্শ জানার আগ্রহ জাগিয়ে দিত ।

তখনকার পিতা-মাতারা সন্তানদের শুধু পড়াশোনার দিকে নজর দিতেন না বরং তাদের আচার-আচরণ, নৈতিকতা ও আত্মিক বিকাশের প্রতিও গুরুত্ব দিতেন। নামাজ, কোরআন তিলাওয়াত, দরুদ শরীফ পাঠ, বড়দের সম্মান করা, শিক্ষককে মান্য করা, ছোটদের স্নেহ করা এসব ছিল পারিবারিক শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

আজকের বাস্তবতা অনেকটাই ভিন্ন। প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার, ব্যস্ত জীবন এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে পরিবারে একসঙ্গে বসার সময় কমে যাচ্ছে। এখন অনেক শিশুর সন্ধ্যার সময় কাটছে মোবাইলের পর্দায়। অথচ এই সময়টুকুই হতে পারে তাদের হৃদয়ে সুন্দর মূল্যবোধ গড়ে তোলার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ।

তাই আমাদের হারিয়ে যাওয়া সুন্দর রেওয়াজগুলো ফিরিয়ে আনা প্রয়োজন। সন্তানদের ওপর কঠোরতা নয় বরং ভালোবাসা ও আন্তরিকতার সঙ্গে ছোট ছোট আমলের অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। মাগরিবের আজানের পর কয়েক মিনিট পরিবারের সবাই মিলে দরুদ শরীফ পাঠ করতে পারে। এর সঙ্গে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনের একটি ছোট ঘটনা, একটি সুন্দর হাদিসের শিক্ষা কিংবা তাঁর কোনো মহান চরিত্রের কথা সন্তানদের সঙ্গে আলোচনা করা যেতে পারে। আরো আলোচনা করা যেতে পারে মহান মানুষদের জীবনের নানা দিক নিয়ে। যা সন্তানকে সুন্দর মূল্যবোধ তৈরিতে সহায়তা করে। এতে শিক্ষা শুধু বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকবে না বরং তা পারিবারিক জীবনের অংশ হয়ে উঠবে।

ব্যস্ত ও প্রযুক্তিনির্ভর জীবনে এই সুন্দর ঐতিহ্যকে নতুন করে চর্চায় ফিরিয়ে আনা জরুরি । বিশেষ করে রবিউল আউয়ালের ঈদে মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামে এই মাসসহ সবসময় আমরা যদি এটি ধরে রাখতে পারি তা আমাদের মনকে প্রফুল্ল ও সতেজ রাখতে সহায়তা করে। কারণ, প্রিয় রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর পরিবারবর্গের প্রতি দরুদ পাঠ শুধু দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণই বয়ে আনে না, বরং তা আমাদের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক জীবনকে সমৃদ্ধ করে তোলে। সন্ধ্যার আজানের পর কয়েক মিনিট দরুদ শরীফ হয়তো একটি ছোট্ট আমল কিন্তু একটি শিশুর হৃদয়ে এটি হয়ে উঠতে পারে আজীবনের এক সুন্দর স্মৃতি এবং নবিপ্রেমের এক অনন্য সূচনা।

শেখ বিবি কাউছার
প্রভাষক
ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ
নোয়াপাড়া ডিগ্রি কলেজ
রাউজান, চট্টগ্রাম।